My Attitude!

My Attitude!

Pages

My Blog List

Meet and Recognise-- I, Me and MySelf...!

@@@ ~WELCOME TO MY CYBER WORLD~ @@@











~~~ I am My Own Music, People Want to Get in Touch With Me... Play Your Lyrics By My Rhythm ~~~



Sunday, June 24, 2018

রাফখাতা ৬


বেলা ১১টার আকাশটা যে এমন ভাবে ডুকরে কেঁদে উঠবে - কেই বা জানত ! সারা রাত বিলাপ , ভোর রাতে প্রলাপ এবং দিনভর কালি ফেলা চোখে তার গোমড়াথেরিয়াম মুখ দেখেই বুঝেছিলাম ঝেঁপে কান্না আসবে । এলোও নিয়ম মত । কিন্তু শহরের ব্যস্ত ট্রাফিকে পেশাদার নাগরিক সমাজকে ত্রস্ত করেই এলো । ওয়াইপারের স্পীড যখন লো থেকে হাই করে ফেলতে বাধ্য হলাম , তখন 'শাওন গগনে ঘোর ঘন ঘটা'র মূহুর্মূহু তর্জন গর্জন । এরমধ্যেই হঠাৎ একটা ছবি আমায় টাইম মেশিনে চাপিয়ে এক আলোকবর্ষ পেছনে নিয়ে গেল ।
লাল টুকটুক রেনকোটে ঢাকা সাড়ে তিন ফুটের এক সিল্যুয়েট ! পাশে তার হাত ধরে দাঁড়িয়ে বাবা । রেনকোটের পেছনের উঁচু পিঠ জানান দিচ্ছে মা সরস্বতীর বরপুত্র না হোক, বিদ্যে বোঝাই ছোটবাবু তো বটেই !
রেনকোট ... আমার ৪২ টা জলের বোতল আর ২১ টা পেন্সিল বাক্স হারিয়ে যাওয়া প্রাইমারি স্কুল জীবনের সাক্ষী । উষাগ্রাম গার্লসের সেইসব পাশ-ফেলের দিনে আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে যে জিনিসটা ঠিক সময় মত স্কুল ব্যাগে ঢুকে যেত , তা হল ওই রেনকোট । রুটিন অনুযায়ী বইখাতা নিতে ভুল হলেও ,ওইটা নিতে ভুলতাম না।
একটা ধারণা , যা অঙ্কে ভোঁতা মাথায় ভয় ধরিয়ে দিত তা ছিল ' নিজে ভিজলে ক্ষতি নেই । কিন্তু বইয়ের ব্যাগ ভিজলে মা সরস্বতী পাপ দেবে , এবারের অ্যানুয়ালে ডাহা ফেল !'
ডাক-ব্যাকের মোটা নেভি ব্লু রেনকোট যা ওই তিন ফুট হাইটের আমার হাঁটুর নিচ অবধি ঝুলত, তাকে ধরে পাকড়ে , টেনে টুনে গোড়ালি অবধি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলত ঝমঝমে শ্রাবণের বিকেলগুলোয় । বই ভিজলে পাপ, আর জুতো ভিজলে সর্দি-জ্বর-মার খাওয়া -- তবে কোনটার ইম্প্যাক্ট যে বেশি সেইটা ভাবতে ভাবতে আর এই টানাটানির চোটে পিঠের উঁচু মতন বিদ্যে-ঢাকা-অংশটা প্রতিবারই ফেটে যেত । ফলে ভেজা সরস্বতী নিয়ে পরীক্ষায় পাশ-ফেলের টেনশানটা রয়েই যেত । সেটা আরো বেড়ে যেত মলাট দেওয়া খাতার মাঝের পাতা ছিঁড়ে নৌকা বানানোর সময় । বিশেষত সেই খাতা যদি ভূগোল কিম্বা অঙ্কের হয় !
কিন্তু রেনকোট পরে কাগজের নৌকা না বানালে তো ক্লাস ফোরের মানইজ্জত থাকে না , বিশেষত সেগুলো যখন বাস থেকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে নুনীয়া নদীতে ফেলার প্রতিযোগীতা চলে । সেই প্রতিযোগীতায় হার -জিত নেই, কিন্তু নাম না দিলে প্রস্টিজে গ্যামক্সিন ! হেরো পার্টি ।
পূর্ণিমার বোন কৃষ্ণাকে দেখতাম জুতোজোড়া খুলে খালি পায়ে দাঁড়িয়ে থাকত স্কুল গেটের ধারে ।
-'
কিরে, এভাবে কেন দাঁড়িয়েছিস ? জুতো কই ?' - উত্তরে কান এঁটো করে হেসে সে বলত , 'রেনকোটে ব্যাগেল ভেতল ।'
আমরা কপালে চোখ তুলে যখন বইখাতার সাথে জুতোর সহাবস্থান নিয়ে হাঁ- হাঁ করে হাত পা নেড়ে কিছু বলতে যেতাম , তখন ও বেমালুম বলে ফেলত ' জুতো ভিজলে ইস্কুলে আসব কি কলে ? পলিক্ষা দেব কি কলে ? তাই পেলাস্টিকে ঢুকিয়ে অন্য খোপে ভোলেচি । আমাল ব্যাগে দুটো খোপ , জানো ! ' - আমরা বেকুব বনে ঢোক গিলতাম।
সত্যি তো, এইটা তো মাথায় আসে নি । ছোটরা এভাবেই চমকে দিয়ে সমীহ আদায় করে নিত । ভাগ্যিস রেনকোট ছিল ! বড়দের জলের ছিটে বাঁচানো সন্তর্পণ হাঁটাচলা অথবা ছাতার গাম্ভীর্যকে কাঁচকলা দেখিয়ে দেখিয়ে জল ছপছপ করে দৌড়ে যাওয়া যেত বৃষ্টির পরোয়া না করেই ; ' বৃষ্টি আমায় ধরতে পারে না ' - বলতে বলতে ।
হাই স্কুলের উঁচু ক্লাসে যখন হাইটের সাথে ব্যাগের ওজন বাড়ল, তখন রেনকোট ভরার জায়গাটা হাত বদলে নিয়ে নিল ছাতা । নাহ, ছাতায় মাথা ঢাকা গেল ঠিকই, তবে রেনকোটের বাহারি কুঁজওয়ালা আভিজাত্য রইল না ।
ঠিক যেমনভাবে জলের গেলাসের (কারু মতে গ্লাস) আভিজাত্য কেড়ে নিল প্লাস্টিকের ব্যস্ত বোতল । সেই জমিদারও নেই, সেই জমিদারিও নেই - বংশের কুলীনতা বলতে ডি এন তে কিস্যু নেই । তবু যখন পঞ্চব্যঞ্জ বেষ্টিত থালা-বাটির পাশে রাখা লতাপাতার কাজ করা বাহারি জগের ছুঁচালো মুখ থেকে বর্ণহীন পানীয়টি ধারা বেয়ে নেমে পড়ত গেলাসে - তখন হু-হু তৃষ্ণাটা আচানক বেড়ে যেত । হোক না তারা স্টিলের , কাঁসার বিলাসিতা নাই বা থাকল তবু জল , জগ, গেলাস - সমার্থক ছিল সেই সময় । রেনকোটের মত গেলাসেরও একটা আলাদা সম্মান ছিল । এখন অতিথিদের জন্য গেলাস তোলা থাকে কাঁচের কুলুঙ্গিতে - তাকের শোভাবর্ধনই যার প্রাত্যহিক কাজ । তাকের ভেতর থেকে সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখে রঙিন প্লাস্টিক বোতলের দিকে ।
বাঙালি পেশাদার হোক না হোক , কিন্তু যেই না যেমনতেমন পেশায় ঢুকল অমনি সে ভয়ানক ব্যস্ততার মুখোশে ঢাকা পড়ল । আর ব্যস্ততার অছিলায় বোতল গেলা শিখল । এখন স্কুলের বাচ্চাদেরও বোতলে মুখ । ঠিক যেমন রেনকোটের জায়গায় তারা ছত্রধর হতে স্বচ্ছন্দ্য । ইঁদুর দৌড়ে তারাও মারাত্মক ব্যস্ত কিনা !
গেলাস আকারের ঢাকনা আঁটা জলের বোতল, যাতে জল ঠাণ্ডা থাকে -সেসব কুলীন পাত্র এখন মিউজিয়ামে অথবা গিফট কর্নারে দ্রষ্টব্য । সবাই এখন বোতলের ছিপি খুলে ঢকঢকিয়ে 'তেষ্টা' মেটায় । কিন্তু চুমুকের 'তৃষ্ণা' মেটে কি !
এমনিভাবে হারিয়ে যাওয়া টিনের বাক্স, হলুদ- সবুজ ফিতে , ব্যাঙ্গাচি খোঁচানো বিকেল , রেনিডে-র ইচ্ছেকৃত ভেজানো স্কুল ড্রেস , ব্যাঙের ছাতার নিচে একবার অন্তত মাথা গলাবার আপ্রাণ চেষ্টা , ফার্ণ মস এবং অন্যান্য শ্যাওলাদের নিয়ে জীবনবিজ্ঞান বই মিলিয়ে বিস্তর গবেষণা, ঘাস ফড়িং ও সূঁচ ফড়িঙের লেজে লেজে সুতো বেঁধে উড়িয়ে দেওয়া অথবা লন্ঠনের তাপে ভেজা বই শুকানোর আষাঢ়ে দিনগুলো নিয়ে রাফখাতার পাতায় কাটাকুটি খেলতে খেলতে বৃষ্টি দেখি ।
রেনকোট হোক বা জলের গেলাস - যা কিছুই হারানো অতীত , তাই নিয়েই আমার রাফখাতা জলকেলি শুরু করে ।
তারই মধ্যে কখনোসখনো যখন এক ভেজা চড়ুই গা ঝাড়া দিয়ে জানলার গ্রিলে ঠেস দেয়,
অথবা পথ ভুলে কোনো এক বেজোড় শালিক ভেন্টিলেটরের অতিথি ফুড়ুৎ এর সাথে ঝগড়া করে , অথবা ব্যালকনির পাতাবাহারের লালচে পাতাগুলো জলের ছিটেতে স্নান সারে ,
তখন বড় গোপনে টের পাই , আমার রিক্ত মনের আনাচ কানাচও আমূল সিক্ত হচ্ছে ।
বাইরের কালো আকাশে তখন 'গুরু গুরু মেঘ গুমরি গুমরি গরজে গগনে গগনে '
আমি জানলাটা হাট করে খুলে দিই । বৃষ্টি ছুঁই ।

রাফখাতা ৫


তখন ফেসবুক ছিল না , মেসেঞ্জার ছিল না, ফোনও ছিল না, টিভি ... নাহ তাও ছিল না । যোগাযোগের পৃথিবীটা তখন আধুনিক ছিল না মোটেই । সেই সময় লোডশেডিং, লম্ফ জ্বালা, লাটিমের সুতো আর লাল চোখের গুরুজন নিয়েই আমরা আধুনিকতা পালন করতাম। বড্ড যাচ্ছেতাই রকম ছাড়া ছাড়া টাইপ জীবন ছিল আমাদের । মার্কেটে প্রতিযোগিতা এমন গাঁতিয়ে আসে নি , হেড স্যর আর সংস্কৃত স্যারের মারের ভয়ে পড়া তৈরি হত রাত জেগে, পাশাপাশি বাড়ির রোববার বিকেলে উত্তম-সুচিত্রা যেমন থাকতেন তেমনি ভেসে আসত হারমোনিয়াম নিয়ে গানের রেওয়াজের সুর , কিছু বেহেড মাতাল তখনও রাতের মায়াজাল ছিঁড়ে বেমক্কা চেঁচিয়ে উঠত , চুরি চামারিও হত এদিক ওদিক , জাল কারবার বছরে এক আধটা নিশ্চয় শুনতাম ,কিন্তু 'বালছাল', 'চু**' , 'ফা**' বা 'ঘাপলা'-র মত শব্দেরা জন্মায় নি, পাড়ার মাঠে ছেলেদের সাথেই ক্রিকেট খেলা আর পড়ার ফাঁকে গল্পের বইয়ের নিষিদ্ধ হাতছানিতে সায় দেওয়া - এরকম একটা প্রি-মর্ডান বাংলা মিডিয়ামের দিন ছিল ।
তা সেইসব দিনে, ১৯৯৯ -এ ঘরের ভেতর ৪৭ দিন ব্যাপী ময়ালকায়া বন্যাকে পেয়েছিলাম । আমাদের ছাদে আশ্রিত এক দম্পতির যমজ বাচ্চা হল - 'বাদল' আর 'বর্ষা' নামে , সেইসময় প্রসূতির পুষ্টিকর খাদ্য আর বাচ্চাদের জন্য দুধের আকালে বুঝেছিলাম অভাবের কষ্ট কাকে বলে ।
ভাতের ফ্যানার সাথে আটা মিশিয়ে একটা বিশ্রী দূর্গন্ধওয়ালা তরল চোঁ চোঁ করে খেতে দেখেছি বানভাসি বাচ্চাদের । মন্টু নামে যে লোকটা আমাদের বাড়িতে পড়ে থাকত, ফাইফরমাস খেটে দিত , তাকে দেখতাম পেটে ভিজে গামছা বেঁধে ত্রাণের কাজে হাত লাগাতে । 'ভিজে গামছা কষে পেটে বেঁধে রাখলে খিদে পায় না' - জেনেছিলাম ওর কাছেই ।
হেলিকপ্টার থেকে ছুঁড়ে দেওয়া চিড়ে, মুড়ি , গুড়-বাতাসা অথবা ওষুধ নিয়ে যখন কাতারে কাতারে লোকের কাড়াকাড়ি পড়ত , আর আমি সহ দুজন বাচ্চা জলে হামেশাই পিছলে পড়ে যেতাম , হাঁকুপাঁকু করে কাদামাখা জল খানিক ঠেলে, খানিক গিলে যখন সেই লাইনে পৌঁছে দেখতাম সব শেষ হয়ে গেছে - সেইসময়ে বুঝেছিলাম খিদের জ্বালা কী !
তখন একদিন মন্টুকাকার মতই পেটে ভিজে গামছা বেঁধে থাকতে হয়েছিল ।
আমাদের স্কুলে যে অগুনতি মানুষ সেবার আশ্রয় নিয়েছিল তাদের কাছে ফেজ টুপি বা পৈতের কোনও মূল্য ছিল না । গাদাগাদি করে বেঁচে থাকতে থাকতে তাঁদের নাম বিভ্রাট হত হামেশাই । তাদের হাতে হাতে গাঁথা ইঁট-মাটির প্রাচীর, ত্রিপলের অস্থায়ী ছাদ আর বালির বস্তা দিয়ে জল আটকানো বাঁধগুলোই বেঁচে থাকার মন্ত্র শোনাত - নাহ, কোনও ঈশ্বর আল্লাহ সেই মানচিত্রে ছিলই না ।
সেইদিন সবাই দেখেছিল একতা কাকে বলে ।
খাট থেকে নেমে যে সকালটায় জলের মধ্যে পায়ের নিচে বিশাল এক সাপের ছটপটানি টের পেয়েছিলাম সেইদিন বুঝেছিলাম ভয় কাকে বলে ।
নাহ, তবু কেউ কিন্তু সাপ মারার জন্য লাঠি হাতে আসে নি । মানুষ, গরু, সাপ, বাঁদর আর কোনোক্রমে বাঁচানো চালের বস্তাগুলোর এক অদ্ভূত সহাবস্থান ছিল সেইসব দিনে । ভেসে যাওয়া গরু, ছাগল , মাছ অথবা বিষাক্ত প্রানী - কেউই কারুর শত্রু ছিল না । নৌকা করে যখন আমাদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার ফরমান এল, তখন একই নৌকায় ওরাও উঠেছিল - পদবী জেনে কাউকে নামানো হয় নি । আমরা সবাই সবাইকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম শুধু । সেদিন গো-মাংসভুক আর নিরামিষাশীদের মধ্যেও যে বৈরিতা থাকতে পারে - ঘুণাক্ষরেও কেউ ভাবতে পারে নি ।
ট্রেনের মধ্যে আলুর বস্তা ভরার মত করে যখন জ্যান্ত মানুষ ভরা হচ্ছিল , সবাই চাইছিল নিরাপদে বাঁচার একটুকরো শুখা জমিন পেতে ।
সেই কালো রাতে গৌড় এক্সপ্রেসের নিঝুম কামরায় এক নেশাতুর লোক যখন বাথরুমের দরজা আটকে আমার দিকে তার নোংরা থাবা বাড়িয়ে ধেয়ে এসেছিল - সেদিন টের পেয়েছিলাম বোবায় ধরা আতঙ্ক কাকে বলে ।
তাকে ঠেলে ফেলে দিয়ে এক ছুটে যখন বাবা আর সাহাকাকু দুজনকেই জানালাম , আর সাহাকাকুই বাবার আগে দুটো কিল বসালো লোকটাকে - সেদিন বুঝেছিলাম স্নেহ কাকে বলে ।
তবু আমরা পাশাপাশিই ছিলাম। সমস্ত অসুন্দরকে একসাথে সহ্য করে একসাথেই তো বাঁচতাম আমরা ।
তখন, বিফ আর পর্কের শত্রুতা জানা ছিল না - খিদেটা কিন্তু একই ছিল ।
তখন, মন্দির আর মসজিদের ধারে বাতাসা লোভী হাতগুলো জড়ো হত - দেওয়াল ভাঙাভাঙির চিন্তা ছাড়াই ।
তখন, লুঙ্গি, বোরখা, ধুতি বা ঘোমটার আকচাআকচি নিয়ে কারুর মাথাই ঘামত না- পালাপার্বণে বছরে একটা বা দুটো নতুন পোষাক পাওয়ার লোভনীয় চাহিদা থাকত বলে ।
কি জানি, তখন অভাব ছিল বলেই হয়তো স্বভাব নষ্ট হতে পারে নি ।
তাই হয়তো পাকা ছাদের অপেক্ষায় থাকা ভট্টাচায্যি কাকুর ছেলে সেবার নিশ্চিন্তে শুতে পেরেছিল ইঁটভাটার আমিনা বিবির কোলে, ফাহিমের সাথেই ।
আধুনিকতার ছোঁয়াচ মুক্ত ওরা 'কাবার উপরে শিবের ফটো কেমন করে বসতে পারে' - এ নিয়ে ভাবার সময়ই জুটাতে পারে না । কাবার অবস্থান নিয়েই স্বচ্ছ ধারণা নেই তাদের ।
স্বচ্ছ ধারণা কি ওদেরও আছে যারা বোমা বাঁধে, লাঠি-চাপাতি চালায়, ঘর পোড়ায়, মিছিল করে, বিক্ষোভে শিশু এবং নারীদের ঢাল বানায় !
আজকে ২০১৭ -য় আমাদের চেনা পাড়াগুলোয় 'অভাব'-এর বড় অভাব ।
এই স্বচ্ছল আধুনিক সমাজটার একটা মোক্ষম মন্বন্তর কিম্বা ভয়ংকর বন্যা দরকার ।
তখন মানুষ বুঝবে ভালবাসা কী , বেঁধে বেঁধে থাকার বাসনা কেমন দেখতে , প্রিয় পোষ্য জলে ভেসে গেলে কেমন কষ্ট হয় , পাউরুটির ফাংগাস সরিয়ে খাওয়ার পর কতটা তৃপ্ত লাগে খিদে পেটে !
রবি ঠাকুরের গানে , শুকতারা পাতায়, মোগলি আর সিঞ্চ্যানের সরলতায় অথবা পিকলুর প্রথম আঁকা ছবির মধ্যে ঈশ্বর দর্শণের আনন্দ কতটা - সেটা আজকের ঈশ্বরভক্তদের জানা খুব দরকার।
আজ তাই বিষাক্ত বিষন্ন বিকেলে 'এত রক্ত কেন?' -এই টপিক বাদ দিয়ে, বরং আমার রাফখাতার প্রতিটা ছেঁড়া পাতা 'একটি সর্বজনীন অভাব' -এর প্রার্থনায় রচনা লেখে ।
বুকশেল্ফের দাগিয়ে পড়া বইগুলোয়ের ফাঁকে ফাঁকে লুকানো ঈশ্বর তখন মনে মনে আশীর্বাদ করেন - সে আমি নিভৃতে টের পাই ।

রাফখাতা ৪


প্রায় দু'বছর পরে আজ নিজের জন্মস্থানে গেলাম , মা-কে নিয়ে । সাথে পক্ষীরাজকাল্লা হাসপাতাল, মানে যেখানে আমার জন্ম হয়েছিল , আজও সেখানকার রাস্তা এবড়োখেবড়ো । আজও সেখানে যেতে গেলে চড়াই উৎরাই আর কাদা জলের খানা খন্দর পার হতে হয়, গত কুড়ি বছর ধরে জায়গাটা একরকম । নজরুলের নামে বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে, তবু রাস্তার ভোল বদল হয় নি ।
তবু ওই কিছু কিছু ব্যাপার ঘটে না, যেগুলোর কোনো মাথামুণ্ডু নেই, যুক্তিবোধ নেই, কার্যকারণ নেই; অনেকটা সেই নিয়মেই আজও সেখানকার বাতাসে এক অদ্ভুত নেশা নেশা গন্ধ ভাসে , রাস্তার ঢাল আর স্পীডব্রেকারগুলোয় আজও নাটুকেপণা অনুভূত হয় - ঠিক যেমনটি স্কুল বাসের পেছনের সীটে লাফাতে লাফাতে হল্লা করতে করতে যাওয়ার সময় লাগত আমাদের ।
আশ্চর্যের বিষয় হল , এই গন্ধটা বা এই নাটুকেপণার গোপন অনুভূতিটা কেবল আমিই পাই । বাকিদের ' ধুস ! এই অঞ্চলের আর কিছু হবে না ! বিহারীতে ভর্তি, ওয়াক ওঠা গু-গোবরে ভর্তি পথ ঘাট । থাকা যায় ?' - এই হল মোদ্দা কথা । এইজন্য বোধহয় ফ্যান্টাসিদের নিয়মে পরিণত করা উচিৎ না , মাঝেমাঝে যাও, মাঝেমাঝে আহ্লাদিত হও - খুশি থাক ।
আর এই খুশি জিনিসটা বড্ড আপেক্ষিক ।
এই যেমন নুনিয়া নদীর উপরের রাস্তাটার ,যেখানে ছট পুজোয় প্রচুর ভিড় হয়, লাইট লাগে , সেটার ঢাল দিয়ে যখন পক্ষীরাজকে গড়াতে দিলাম , তখন ওর চাকার শিহরণগুলো আমার সেই প্রথম সাইকেল শেখার দিন গুলোকে মনে করাচ্ছিল । বিচিত্র স্বরে বোঁওওও... করে আওয়াজ তুলে ওখানটায় সাইকেল চালাতাম , প্যাডেল করতে হত না , শুধুই হালকা ব্রেকে আঙুল - ব্যস, মনে হত যেন উড়োজাহাজের জানলা খুলে উড়ছি ! আজও তাই হচ্ছিল , শুধু ব্রেকে আঙুলের বদলে ছিল পায়ের পাতা । মনে মনে বোঁওওও... করতে গিয়ে টের পেলাম ঘনশ্যামের খাটালটা থেকে কয়েক জোড়া চোখ এদিকে তাকাচ্ছে । হোক না আয়তলোচন মোষ শাবক - তবু দর্শক তো ! শব্দটাকে গিলে নিলাম - কিন্তু খুশিটা একই থাকল ।
ফেরার পথে মা বলল, " শখ মিটল ! কবে থেকে কাল্লা যাব, কাল্লা যাব ড্রাইভ করে বলে বায়না করছিলি -মিটল তো !"
মাকে বললাম বটে 'হ্যাঁ' , কিন্তু মনে মনে তো জানি, মেটে নি ।
কি করে মিটবে ?
হাসপাতালে তো যাওয়াই হল না । ওখানকার কেবিন , বেড বা নিদেন পক্ষে মেডিসিন মেডিসিন অর্বাচীন গন্ধটাও নেওয়া হল না ।
রাস্তার পাশে পক্ষীরাজকে পার্ক করতে গিয়েই দেখি আমার সেই হোস্টেলটা তার বৃটিশ আমলে নির্মিত জরাজীর্ণ কাঠামোটা নিয়ে একইভাবে দাঁড়িয়ে । ঢুকতে যাব , ওম্মা দেখি শেকল পরানো রয়েছে তার মেইন গেটে ! নিজের বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে যদি দেখ ভোজবাজির মত 'নো-এন্টির সাইনবোর্ড' ঝুলছে তোমার জন্য -কেমন লাগবে ? প্রথম গেট বন্ধ, দ্বিতীয় গেট বন্ধ, তৃতীয় গেটের একেবারে শেষে প্রায় আধ কিমি ঘুরে তবে মিলবে ঢোকার পথ ! যেতে পারলাম না । মায়ের তাড়া ছিল, কাজ শেষ হচ্ছে , ফিরতে হবে ।
পাড়ার আনন্দদা , যার কাছ থেকে প্রথম পাবলিক বুথ কী হয় চিনতে শিখেছিলাম - সে যখন ব্যাঙ্কের সামনের গাছতলায় হঠাৎ 'কেমন আছ ?' বলে উঠল , আমার স্মৃতির পাতায় নাম হাতড়াতে দু সেকেন্ড সময় বেশি লাগলেও খুশির প্যাঁটরা খুলতে সময় লাগে নি । সময় লাগে নি তখনও যখন ভিড়ের মধ্যেও ' ওম্মা !কদ্দিন পরে দেখছি তোদের ! " বলে পিঠ চাপড়ে দিল অনিতা মাসি , স্যরি আমার 'লালী' !
এইসব নষ্ট জিয়াদের ধড়কন যখন চলছিল, তখন দূর থেকে বোধহয় ওরা দেখতে পেয়েছিল আমায় , নইলে চিরদুঃখী তালগাছটা হঠাৎ দুলেই বা উঠবে কেন , আর টিনের ভাঙা ট্রি গার্ডের মধ্যে বেড়ে ওঠা কামিনী গাছগুলোই বা দু'চারটে ফুল গড়িয়ে দেবে কেন ! না না, দু'চারটে নয় - বেশ অনেকটা ফুল একসাথে । টিনের যে ট্রি গার্ডের মরচে পড়া ভাঙা কোণা লেগে আমার বাম উরু ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল কুড়ি বছর আগে , সে গাছ একইরকম আছে , সাথে ওই ভাঙা টিনের কোণটাও । একটু বুড়িয়ে গেছে - এই যা ।
শতাব্দী প্রাচীন আমাদের হোস্টেলের গায়ে দেখলাম নতুন রঙের পোঁচ লেগেছে , কোম্পানির তুঘলকি মর্জি ! তা শরীরে নতুন পোষাক যাই চাপুক, শিরাধমনীর পাকদন্ডীতে ছড়ানো পুরোনো গাছেরা জানে এখানকার হৈ চৈ মাখা যৌবনের কথা । তিনটে শিশুর বড় হওয়ার কথা । তাদের শারদীয়া হাসি -কান্না, সরস্বতীপূজোর অঞ্জলী ভাগ করা, বিসর্জনের ভাংরা নাচ , অংকে লাল কালি পাওয়া ঘোর বর্ষাদিন অথবা আম কুড়ানি বোশেখের কথা ।
কাল্লা ঘুরে এলে মনে হয় ওই দিনগুলোকে ছুঁয়ে এলাম । নাই বা থাকল চকচকে রাস্তা, নাই বা থাকল সাজানো গোছানো দোকানপাট - যে 'জীবন গিয়েছে চলে কুড়ি কুড়ি বছরের পার...' তার স্মৃতিদের কী সাজগোজ মানায় !
বেসমেন্ট পার্কিং লট থেকে বেরোতে গিয়ে দেখি, আমার পক্ষীরাজের টায়ারের গায়ে কৃষ্ণচূড়ার পাপড়ি লেগে আছে । এই আষাঢ়েও কৃষ্ণচূড়া ! ওই যে বললাম না কিছু কিছু ব্যাপার ঘটে যার কার্যকারণ থাকতে নেই - শুধু ভাল লাগার রেশ থাকাই যার ভবিতব্য ।
কাল্লার চড়াই উৎরাই রাস্তা হোক, কাদাজলের বন্ধুরতা হোক বা কৃষ্ণচূড়ার আলগা প্রেম - আজকের রাফখাতা আমার অযৌক্তিক খুশিদের স্মৃতিকথায় সিক্ত হয়ে রইল ।

রাফখাতা ৩


আষাঢ়ের প্রথম দিনেও তেমন বৃষ্টি হল না । ঐ বিকেলের দিকে ঢিমে তালে খানিক ঝিরি ঝিরি ... মাত্র ৫৯ সেকেন্ড ! হ্যাঁ, পুরো এক মিনিটও না । তবু ভাল লেগেছিল । নিয়ম রক্ষা বলেও তো কথা আছে ।
এই যেমন আজকাল বৃষ্টিতে আর রামধনু ওঠে না , ময়ূরের নাচ দেখতে মেলে না - দূষিত শহরের আকাশ ধূসর, মাটি ধূসর, ধূসর মনের আনাচ কানাচ - তবু শহরের মাটির বুকে প্রথম বৃষ্টির সোঁদাসোঁদা গন্ধটা তেমনি ওঠে আজও । ওই যে নিয়ম রক্ষা । তাতেই খুশি হতে হয় ।
জন্মদিনগুলোও তেমনি নিয়মরক্ষার শুভেচ্ছায় ভেসে যায় অন্তহীন । তাতেই আমরা কেমন দিব্যি আমোদের আমুদরিয়ায় ভাসাই সুখের সাম্পান । 
ওরা বলে, সোশাল মিডিয়ার আসল নাম আনসোশাল মিডিয়া । তত্ত্ব কথার শিক কাবাব আর বিপ্লব নামক হুইস্কির সাথে খানিক আদিখ্যেতার চাট মশালায় এক কন্টিনেন্টাল ডিশ - যা গিলে আপামর জনগণ অসামাজিক হয়ে যাচ্ছে, নিয়মিত । ওরা ভুলে যায় পৃথিবীর আনাচ কানাচে জন্ম দেওয়া খ্যাত অখ্যাত ছোট ছোট আন্দোলনগুলোকে যারা শাসকের চেয়ার কিছুটা হলেও নড়াতে পেরেছিল - সোশাল মিডিয়াই ছিল সেসবের আঁতুড়ঘর ।
আমি শুনে যাই , দেখে যাই । খুব একটা প্রতিক্রিয়া দিই না । কারণ প্রতিক্রিয়া আমার কাছে নিয়মরক্ষার বিষয় না - অন্তত এখনও অবধি ।
চেনা সম্পর্কগুলোও দ্রুত নিয়মরক্ষায় বদলে যায় - আমরা টের পাই, কিন্তু প্রতিক্রিয়া দিতে পারি না ।
ছাত্রছাত্রীরা , ক্লাসে ঢুকলে নিয়ম রক্ষায় দাঁড়ায় - ইচ্ছে না হলে বসে থাকে । নিয়মরক্ষার শ্রদ্ধাজ্ঞাপণ - সিলেবাস এটুকুই শিখিয়েছে , বাকিটা অফটপিক, ব্রাত্য । বয়ঃজেষ্ঠরা আক্ষেপ করেন একাল সেকাল নিয়ে । আমরা চুপচাপ সয়ে যাই ।
ওরা বলে, সেই সব সুবর্ণযুগ কি আর আসবে ! এখন সবটাই দায়সারা ।
আমি ভাবি, সুবর্ণযুগ নাই বা এল, রৌপ্য যুগ, প্ল্যাটিনাম যুগও আসতে পারে - ক্ষতি কি !
ঠিক যেমনভাবে জন্মদিনের পায়েসের স্থান নিয়েছে কেক ,
শনিবারের বিকেলে বন্ধুর বাড়ি যাওয়া অথবা রোববারের দুপুরে মাংস ভাতের ঘুমের স্থানে এসেছে উইক এন্ড ট্যুর - ঠিক তেমনিই নিয়মের বাইরেও দিনের চাকা ঘুরছে ।
নিয়মের বাইরেও কিছু পাওয়া জমে থাকে । না-পাওয়ার জমাখরচের হিসেব আর অপ্রাপ্তির দীর্ঘশ্বাসের তলায় হয়তো তারা নজরেই আসে না । এই যে এখন নিশ্ছিদ্র আঁধারের মধ্যে যেমন বৃষ্টি হচ্ছে , তাতেই আষাঢ়ের পরশ খুঁজে নিতে হবে । ভোরের বৃষ্টির স্বাদ ভুলেছে ঋতুচক্র, ঘাসফুলের আহ্লাদী শরীরও তাই মাঝ রাতেই স্নান সেরে নেয় ।
'
বন্ধু নেই' বলে নাছোড় মন খারাবীরা যখন আচ্ছাদিত করে, তখন আড়চোখে আলগোছে তাকাই 'সোশাল নাকি আনসোশাল' মিডিয়ার 1000 friends বাক্সের দিকে ! এক চিলতে হাসি জানান দেয় , নিয়মের নিয়মই পালটে যাওয়া ।
রাফখাতার পাতারা আমায় দিয়ে নিয়ম ভাঙ্গার নক্সা আঁকায় । মার্জিন টেনে যে পাতাগুলোয় মুক্তাক্ষর ছাপা হয় , সময়ের মধ্যে গোছানো উত্তর লেখা হয় - তাদের দিকে চেয়ে রাফখাতা ব্যঙ্গের হাসি হাসে ।
আমি ধমকে বলি ' এত বিদ্রুপের কী আছে হে ! সুন্দর জিনিসের তারিফ করতে নেই?'
সে আমার দিকেও অমন চোখে চেয়ে বলে ' সুন্দর ! সে তো নিয়মের সংজ্ঞায় । গোছানো শেকলে বাঁধা অক্ষরমালার সৌন্দর্যের কাছে তুমিও বিকিয়ে গেলে শেষে !
আমার বাবা গোল্লাছুটের মাঠ থাক ।
হিজিবিজি কাটা , রাম-শ্যাম-যদু-মধুদের, ফুল-ফল-নাম-দেশদের আর কাটাকুটি খেলার হারানো শৈশবের কোলাজ থাক । আমার বাবা নিয়মভাঙ্গার স্বাধীনতা থাক । নিয়মরক্ষার ফাঁসে আমার যে দমবন্ধ লাগে !'
আমি গুটিয়ে যাই । রাফখাতার পাতার বেয়াড়া যুক্তির সামনে আমার নিয়মরক্ষার দূর্গ কেমন তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পড়ে ।

রাফখাতা ২

বেলাশেষের সূর্যটার আজও গোলাপি রং, কালকেও এমন ছিল। শেষ বিকেলের ট্রেনে যখন মাঠঘাট নয়ানজুলি পেরোচ্ছি তখনও ঈদ, ইলিশ আর ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি নিয়ে কারা যেন তুমুল ব্যস্ত লেডিস কামরায়। ঘটিগরম আর বাদাম বিক্রেতার গলার সেই চেনা ভঙ্গির ডাক শুনে যেই না হেডফোন খুলে তাকাই, ওম্মা ! দেখি ঈদের ইস্তেহার দেওয়া গলাগুলো কাকে যেন 'হ্যাট হ্যাট' করে তাড়িয়ে দিচ্ছে।
ঝালমুড়িওয়ালা কাকুটার কাকুতিমিনতি কানে যাচ্ছে না ওদের। কি হয়েছে দেখতে ঘাড় বেঁকিয়ে যখন তাকালাম, দেখি বছর ষোল-সতেরোর এক 'জেন্টস' কে ঘিরে চলছে বিস্তর চেঁচামেচি। ট্রেন ছাড়ার পূর্ব মূহুর্তে ঝাঁপিয়ে এসে লেডিস কামরার হাতল ধরার খেসারত যে এইভাবে তাকে দিতে হবে সে বেচারা কি জানত! ফাঁকা কামরার ভেতর জেন্ডার সংরক্ষণটা সে হয়তো সত্যি বোঝে নি। কপাল দিয়ে গড়িয়ে আসা ঘাম আর শুকিয়ে যাওয়া জিভের তালমিল ঠিক করার সাথে সাথে হাত পা নেড়ে সে বোঝাতেই ব্যস্ত ছিল তার ভুল করে ভুল করার কথা। ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির কাব্য করা লেডিসরা যখন প্রায় তাকে ফেলেই দিচ্ছিল, দোলাচল কাটিয়ে উঠে ধরতে যাব ঠিক তখন বছর ষাটের এক বৃদ্ধ তাকে টেনে পাশের কামরায় নিয়ে গেল।
" কখন থেকে বলচি প্রতিবন্ধীতে যাও, ফাকা আচে, ব্যাটা শুনবেই না। "
" আরে, শুনলে তবে তো - কালা কিনা দেখ ! মুখেও তো গোঁ গোঁ - বোবা কি না কে জানে! প্রতিবন্ধী বললে বুঝবে কি করে ! "
-- খুশির ঈদের আলোচকরা হাসির খোরাক পেয়ে যায়। এই আড়াই ঘন্টার ট্রেন যাত্রায় চাট্টি খুশিরও খোরাক জোটে!
ঘটিগরমওয়ালা না হেঁকেই ফিরে যায়। দরজার পাশে দাঁড়ানো সাবুরপাঁপড়ওয়ালাকে চাপা স্বরে বলে " ভাইগ্যে নুলো লোকটা টেইনে নিলে, নইলে ছেলেটার আজ খবর ছিল। "
আমি 'প্রতিবন্ধী' শব্দটার মানে খুঁজতে বসি।
টিকিটের লেডিস লাইন যেন আস্তাকু্ঁড়। শুধু মহিলা বা বয়স্কই নয়, বেশিরভাগ মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আট থেকে আশি নানা বয়সের পুংলিঙ্গ। একমাত্র এই লাইনেই তারা নির্ভয়ে অন্যায্য দাবীদাওয়া করতে পারে এইভেবে যে মেয়েরা মায়ের জাত - সামান্য অনুরোধে হয়তো বিনা লাইনের টিকিটও 'মা-মাসি'রা কেটে দেবেন হাসিমুখে ! কেউ আবার খুচরো পয়সা বন্ধুকে, স্ত্রীকে, বৌদিকে দেবেন বলে দাঁড়িয়ে পড়েন পাশেই। একমাত্র মহিলা কাউন্টারে চলে লাইন নিয়ে গুঁতোগুঁতি। প্রতিদিন ছবিটা এক। বাকি জেনারেল লাইন দিব্যি এগোয় হেলেদুলে। কিন্তু পুলিশ ডাকার দরকার হয় ওই সংরক্ষিত কাউন্টারে।
'প্রতিবন্ধী' আর 'লেডিস কামরা' কেমন কমিক-রিলিফের মত পাশাপাশি থাকে পুরো একঘেয়ে যাত্রাপথে। গা থেকে টপ টপ করে ঝরে পড়া স্বেদবিন্দুর মত থোকা থোকা ব্যঙ্গ ঝরে পড়ে এই দুই কামরার যাত্রীদের নিয়ে। প্রতিনিয়ত নিজেদের মধ্যে বালখিল্য আকচাআকচিতে জড়িয়ে জেনারেল বগির যাত্রীদের খুচরো আমোদ যোগায় এই দুই সেফ প্যাসাজ - ওই বিজ্ঞাপনী লাইনের মত " যাত্রা কি বোরিয়াত সে ছুটকারা পাঁয়ে। "
আমি আবারও 'সংরক্ষণ' আর 'সুরক্ষা' শব্দদ্বয় নিয়ে ভাবতে বসি।
ভাবতে ভাবতে যখন কয়লাঞ্চল এসে যায় তখন হঠাৎ চোখ যায় জানলার পাশের সবুজ ক্ষেতে - রেল লাইনের পাশের ধান জমির মধ্যে দুটো শিশু হাত নেড়ে টা-টা করছে । চোখে তাদের প্রথম ট্রেন দেখার অপার বিস্ময় ! মুহুর্তের 'অপু-দুর্গা'কে পালটা হাত নাড়ার আগেই দৃশ্যপট বদলে যায়। সবুজের মধ্যে সবুজ শৈশবের এক নিষ্পাপ স্থিরচিত্রকে হেলায় ঠেলে ট্রেন ছুটে চলে নিজ নিশানায়। দ্রুত বদলে যায় পাশের ছবিগুলো।
এক স্টেশানে মায়ের হাত ধরে ওঠে ছোট্ট নয় বছর । মুখটা দেখেই মন বলে ওঠে " আয় আমার পাশে বস"।
কি আশ্চর্য ! নাস্তিকের মনের কথাও মাঝেমাঝে অলৌকিক প্রাধান্য পায় - সে আমার কোল ঘেঁষে বসে হাতে এক গোছা বোগেনভ্যালিয়া নিয়ে। মিটিমিটি চেয়ে যখন সে একটা পাপড়ি ছিঁড়ে আমার দিকে তাকায় -- সমস্ত অসুন্দর পলকে মুছে পুরো কামরায় যেন হাজার ভোল্টের ঝাড়বাতি জ্বলে ওঠে।
লোকাল ট্রেনের আড়াইঘন্টার টুকরো কোলাজে আমার রাফখাতা ভরে ওঠে কানায় কানায়।
আরেকটা দিন দেখব বলে আমি কাল হয়তো আবারও টিকিট কাটব - বলা তো যায় না, আবার কেউ ফুল হাতে টা-টা করে যদি ! সে দৃশ্য তো আমার মিস করলে চলবে না, তাই না !

রাফখাতা ১


একটা একটা করে দিন যায় । মৌসুমী দিন , মনখারাবী সকাল নিয়েই এ শহরের ঘুম ভাঙে । প্রতিদিন , চেনা ছকে , চেনা মানুষ নিয়ে সময় এগোয় । সূর্য ওঠে । ডোবেও চেনা ছন্দে ।
চেনা রাস্তার পাশে ওই বাবুর হোটেলের যে ছেলেটা প্রতিদিন কয়লা ভাঙে তার প্রতিটা 'আজ' শুরু হয় মালিকের বকুনি কিছু কম খাওয়ার আশায়, দুটো পয়সা বেশি পাওয়ার আশায় ।
যে শাকবুড়িটাকে সেদিন আমাদের ভিখিরি বলে ভ্রম হয়েছিল সেও জাগে প্রতিদিন , চেনা বাজারের মোড়ে সেও দাঁড়ায় রোজ শাক বেচা পয়সায় বাড়তি দুটো কচুরি কেনার আশায় ; বাড়িতে নয় বছরের বুধিয়ার যে ভীষণ খিদে পায় !
মা -মরা বুধিয়ার বাপ যেমন রোজ চোলাই ঠেকে জ্বাল দিয়ে বেশি রাতে টলতে টলতে ঘরে ফেরে , তেমনি ফেরে সনাতন-দার মেয়েটাও শেষ ট্রেনে শেষ ক্লাস করে ।
রোববার হোক, বা ছুটির যে কোনও দিন , সনাতনদার ছুটি নেই । রোজ সকালে স্কুল যাওয়ার পথে নেতার বাড়ির রাস্তার ওই বাঁকটায় সনাতনদার সাইকেল দাঁড়ানো দেখি , একটু বাঁয়ে চেপে একটু ব্রেক করে যখন ওই পেপার বোঝাই সাইকেলটার পাশ কাটাই বারবার ঘিনঘিনে মাছির মত চোখের সামনে নাচতে থাকে কিছু হাবিজাবি কথা । মেয়েটা কলেজে উঠে গেল , সনাতন-দার শ্রম নিশ্চয় সার্থক হবে এবার । মানুষটা বড্ড ভুল হিসেব দেয় প্রতিমাসে পেপারের বিলে । মেয়ে নিশ্চয় বুড়ো বাপের শেষ জীবনের হিসেবটা ঠিক মতই মিলিয়ে দেবে । নিশ্চয় একদিন সনাতন-দাও ছুটি পাবে, সেদিন সেও হয়তো বা নিশ্চিত চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বেলার দিকে সূর্যের রং দেখবে । ভোরের রং তো তার ঢের চেনা ।
একটা সকাল নিশ্চয় এমনও আসবে যেদিন ঘুম ভাঙা চোখে আমার ইচ্ছে হবে না মোবাইল দেখার । ইচ্ছে হবে না ঘড়ির দিকে তাকাবার । ইচ্ছে হবে না তারিখ মনে রেখে শুভেচ্ছা পাঠাবার । ইচ্ছে হবে না ট্রেন্ড নিয়ে ফ্রেণ্ডরা কি বলছে তা জানার ।
ইচ্ছে হবে না মন খারাপের সাথে দোস্তি করার । ইচ্ছে হবে না পড়া আর লেখার মাঝের দুরত্বগুলো মেপে দেখার । ইচ্ছে হবে না ইনবক্সের মেসেজ খোলার । ইচ্ছে হবে না আমার প্রিয় লেখা, প্রিয় সিনেমা, প্রিয় জিনিস বা প্রিয় মানুষকে নিয়ে 'লোকে-কি-বলছে' ভাবার ।
এলোমেলো এই 'ইচ্ছে হবে না' দের যেদিন কান ধরে মাটিতে নামাতে পারব , সেদিনটায় সত্যি ইচ্ছে হবে 'ভাল-থাকা'র সাথে আলাপ করার ।
সেদিন সনাতন-দার মেয়ের সাথে সত্যি দেখা হবে আমার । সেদিন ধুলো পড়ে যাওয়া বইয়ের তাক সাফ করে 'পাগলা দাশু' নামাব । সেদিন মিডিওকার আমার জন্য আমার গর্ব হবে খুব । সেদিন শিশু আমি-টাকে একটু বেশিক্ষন আদর করব । সেদিন 'ক্ষীরের পুতুল' আর 'রাজার অসুখ' নিয়েই কাটবে সারাদিন । সেদিন সব কুন্ঠা কাটিয়ে নিশ্চয় স্কুল-গেটের ওই ফেরিওলার কাছে মেয়েবেলার কুলগুড়ি আর রাংতায় মোড়া মিঠে-কড়া চাটনি কিনে খাব - গোপনে নয় সব্বাইকে দেখিয়ে ।
সেদিন 'ফুড়ুৎ' -এর সাথে তার ভাষায় আমি কথা বলব , হয়তো সে শুনবে না , হয়তো সে পালিয়ে যাবে রোজকার মত - তবু এটুকু তো জানবে তার একটা বিশ্বস্ত জানলা আছে ঠোঁটে বয়ে আনা খড়কুটোগুলোকে নিরাপদে জমানোর জন্য ।
আমি জানি, সেদিন আমার শুকনো পিস-লিলি চারাটায় সবজে রং ধরবে, সাদা ধবধবে ফুলও ফুটবে , নিশ্চয় ।
ব্যালকনির সবক'টা কোণ জুড়ে সেদিন রাফখাতার পাতা ছড়ানো থাকবে ... এলোমেলো, ইচ্ছেমত... এক্কেবারে স্বাধীন । মা যতই বকুক আমি তো জানব ঐ রাফখাতার ছেঁড়াপাতাগুলোর প্রতিটায় এক একটা 'আমি' জেগে আছি ।